আজ টালিউড ও বলিউডের শক্তিমান অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর জন্মদিন। তার এই জন্মদিনে না বলা কথাই জানালেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়।
ফাটাকেষ্টখ্যাত অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে অভিনেত্রীর ১৩ বছর বয়সেই প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেই প্রথম দিনের কথা স্মরণ করে দেবশ্রী রায় বলেন, মিঠুনদার সঙ্গে আমার ১৩ বছর বয়সে দেখা। তখন আমি বাচ্চা মেয়ে আর মিঠুনদা ‘মৃগয়া’ করে ফেলেছেন। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন অভিনেতা তিনি। তবে স্টুডিওপাড়ায় যাতায়াত থাকার কারণে ততদিনে জেনে গিয়েছিলাম মিঠুন চক্রবর্তী কে?
তিনি বলেন, ‘নদী থেকে সাগরে’ বলে একটি সিনেমায় মিঠুনের বিপরীতে আমাকে কাস্ট করা হলো। সেই সিনেমার সেটে আলাপ। সত্যি বলতে, আমি একটু উত্তেজিত ছিলাম। কারণ মিঠুনদার মতো অমন সুপুরুষ, সুন্দর চেহারার এক নায়ক আমার বিপরীতে! বেশ উত্তেজনা ছিল। আমরা দুজন ছাড়াও ছিলেন সন্ধ্যা রায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
অভিনেত্রী বলেন, মিঠুনদার প্রথম বাংলা সিনেমা কিন্তু আমার সঙ্গে। সিনেমার সেটে ফ্রক পরে যেতাম। সিনেমায় প্রেমের একটা দৃশ্যে আমাকে শাড়ি পরানো হয়। অভ্যাস তো ছিল না শাড়ি পরার, শটের মাঝেই হঠাৎ শাড়িটা গেল খুলে। তখন আমার মায়ের উদ্দেশ্যে মিঠুনদার চিৎকার— মাসিমা, শিগগির এসো! তোমার মেয়েকে দেখো, শাড়ি খুলে দাঁড়িয়ে আছে। সেই থেকে মিঠুনদার সঙ্গে সম্পর্ক। শুধু ওর সঙ্গে নয়, গোটা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। এই হচ্ছে মিঠুনদা। সর্বক্ষণ দুষ্টুমি।
দেবশ্রী বলেন, মিঠুনদার সঙ্গে যে কটা সিনেমা করেছিলাম সবই হিট। উনি সেটে থাকা মানেই আর কাউকে কিছু চিন্তা করতে হবে না। সবাইকে মাতিয়ে রাখেন। হই-হুল্লোড় মানুষ। আবার যেমন দুষ্টু তেমনই বুদ্ধি। অসম্ভব মেধাবী অভিনেতা। ওর সঙ্গে আমার সারাক্ষণ ঝগড়া হতো। সারাক্ষণ যা খুশি তাই বলতাম। সেসব আর এখানে বললাম না। ভীষণ পেছনে লাগত, আমাকে রাগাতে ভালোবাসতেন। আমি রেগে গেলেই ওর উপরে যেভাবে অগ্নিবর্ষণ করতাম, সেটায় খুব মজা পেতেন।
অভিনেত্রী বলেন, মিঠুনদার দুষ্টুমির চোটে একবার আমি মরতে বসেছিলাম। রামোজি ফিল্ম সিটিতে ‘এমএলএ ফাটাকেষ্ট’ সিনেমার শুটিং হচ্ছে, সেই সময় আমার গায়ে সাপ ছেড়ে দেন। কী সাংঘাতিক লোক! আসল সাপ নয় ওটা; কিন্তু কোত্থেকে যেন সেই ‘সাপ’ কিনে এনে আমার কাঁধে রেখে দিয়েছিলেন। আচমকা সেটা দেখেই আমার তো অবস্থা খারাপ! হৃদস্পন্দন প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। তারপর পুরো রামোজি ফিল্ম সিটি আমার চিৎকার শুনেছে। আমিও তো কম নই! মিঠুনদাকে এমন এমন সব কথা শুনিয়েছি। কিন্তু উনি সেসব কখনো গায়ে মাখেননি।
তিনি বলেন, শুধু আমি না, পদ্মিনী কোলহাপুরীও নাকি এমন করেছিলেন! তারও অবস্থা এমনই হয়েছিল। রামোজি ফিল্ম সিটির ঘটনার পর আমার দিদি কৃষ্ণাকে (রানি মুখার্জির মা) মিঠুনদা রসিয়ে রসিয়ে বলেছিলেন— তোর বোনকে যা রাগিয়েছি না!
দেবশ্রী বলেন, মিঠুনদা যখন মুম্বাই থেকে আসতেন, বিমানবন্দর থেকে সোজা চলে আসতেন আমাদের বাড়ি। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতেন। কত আড্ডা হতো। মিঠুনদার তিন বোন। তাদের সঙ্গেও খুব ভাব ছিল আমার। আমাদের সম্পর্কটা এতটাই পারিবারিক ছিল যে, আমরা একই গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিই। আমরা সেই অর্থে ‘গুরুভাই’। আসলে আমাদের স্নেহের সম্পর্ক। এই তো, ‘শাস্ত্রী’ সিনেমার সময় আমি ইলিশ মাছ, পাবদা মাছ রেঁধে নিয়ে গিয়েছিলাম ওর জন্য। মিঠুনদা নিজেও দারুণ রান্না করতে পারেন। যদিও মাংস রাঁধতেন বেশিরভাগ সময়। সেটা আমি খাই না, তাই চেখে দেখা হয়নি বলে জানান অভিনেত্রী।
তিনি বলেন, আমি মানুষটার ওপর রাগ দেখাতে পারি। তাকে বকতে পারি, আমার সেই জায়গা আছে। ‘শাস্ত্রী’ সিনেমার সময় উনি অসুস্থ হতেই হাসপাতালে যাই। ছেলে মিমো মুম্বাই থেকে আসে। যদিও ছেলের কোনো কথা কানে তোলেন না। আমি ধমক দিয়ে বলেছিলাম— এই সময় যাতে হোটেলে না থাকেন। কথা শুনেছিলেন। মিমো বলেছিল— আমাদের কথা তো শোনে না, আপনি বলুন। যাই হোক, আমার কথা ফেলতে পারেননি। যদিও বাবা হিসাবে মিঠুনদা দারুণ। ওর ছেলেমেয়েরা ‘মিঠুন’ বলেই সম্বোধন করে। আসলে মানুষটার তো সত্যিই বয়স বাড়ে না। উনি চিরযুবক।
অভিনেত্রী বলেন, তবে একটা কথা খালি মনে হয় যে, কষ্ট করে মানুষটা মুম্বাই ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা করেছেন। সেটা মুখের কথা নয়। মুম্বাই ইন্ডাস্ট্রিতে পয়লা নম্বর নায়ক, তাও আবার বাঙালি। কম বড় কথা নয়। শুধু কি মুম্বাই? ওর পরিচিতি আন্তর্জাতিক স্তরে। একটা সময় মিঠুনদার মা একটা বছর মৌনব্রত নিয়েছিলেন ছেলের জন্য। ছেলে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া অবধি সেই ব্রত ভাঙেননি।
তিনি বলেন, কিন্তু এমন একটা মানুষকেই যখন কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ব্রাত্য রাখা হয়, তখন আহত হই— প্রতিবাদ করি। এতগুলো বছর ধরে মুম্বাই থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তারকারা আসতেন ওই উৎসবে। কিন্তু মিঠুন চক্রবর্তীকে কেন ডাকা হতো না? উনি যে দলেই থাকুন না কেন, আখেরে তো বাংলার ছেলে! উনি আমাদের রাজ্যকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এর প্রতিবাদ করায় কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে আমাকেও। আমাদের সময় আর কোনো অভিনেতা ছিলেন যিনি মুম্বাই গিয়ে এমন সাফল্য পেয়েছেন?
দেবশ্রী বলেন, কিন্তু তাও তিনি চলচ্চিত্র উৎসবে ছিলেন ব্রাত্য। রাজ্যসরকার সম্মান দেয়নি। কিন্তু বাংলার বাইরে ‘পদ্মভূষণ’ থেকে ‘দাদাসাহেব ফালকে’— সবই পেয়েছেন। যদিও মিঠুনদাকে এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে বলতেন— ছাড় তো, এসব ছোটখাটো বিষয় মাথায় নিস না। তিনি বলেন, উনি মানুষটাই এ রকম প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তাই আমি চাই না, ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এতটুকু বদল ঘটুক। উনি যেমন মানুষ তেমনই থাকুন।


